মঙ্গলবার, ১৫ মে, ২০১৮

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ ও উৎক্ষেপনের ভিডিও

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১

উৎক্ষেপনের তারিখ: শনিবার বাংলাদেশ সময় ভোররাত ২টা ১৪ থেকে ৪টা ২১ মিনিটের মধ্যে উৎক্ষেপণরে সময় করা হয়েছে।

উৎক্ষেপনের স্থান: যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেফ কেনাভেরালের লঞ্চ প্যাড থেকে বেসরকারি মহাকাশ গবেশনা সংস্থা স্পেস এক্সের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু-স্যাটেলাইট-১


গ্রাউন্ড স্টেশন: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায়। মূল স্টেশন জয়দেবপুরের গ্রাউন্ড স্টেশনটি হবে; ব্যাকআপ হিসেবে রাখা হবে বেতবুনিয়ায় স্টেশনটি।

উৎক্ষেপন করা হবে: ফ্যালকন ৯ রকেটে  এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করা হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপনের ভিডিও দেখুন


কক্ষপথে পৌছাতে সময় লাগবে: কক্ষপথে স্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত স্যাটেলাইটের যাত্রার ধাপটিকে বলে লঞ্চ অ্যান্ড আরলি অরবিট ফেইজ (এলইওপি)। এই ধাপে লাগবে ১০ দিনের মত। এরপর কক্ষপথে স্থাপিত হওয়ার ধাপটিকে বলা হয় স্যাটেলাইট ইন অরবিট। কক্ষপথে স্থাপনের এই প্রক্রিয়াটিতে সময় লাগবে ২০ দিন।

নির্মাতা প্রতিষ্ঠান: থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস (ফ্রান্স)।

মোট ব্যয়: স্যাটেলাইটটি তৈরি করতে মোট ব্যায় হয়েছে ২৭৬৫ কোটি টাকা। উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে একনেক সভায় দুই হাজার ৯৬৮ কোটি টাকার ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ’ প্রকল্প অনুমোদন পায়। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় এক হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া পরিকল্পনা নেওয়া হয় ‘বিডার্স ফাইন্যান্সিং’ এর মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহের। এই প্রেক্ষিতে হংক সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সঙ্গে প্রায় একহাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। এক দশমিক ৫১ শতাংশ হার সুদসহ ১২ বছরে ২০ কিস্তিতে ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। স্যাটেলাইট সিস্টেমের নকশা তৈরির জন্য ২০১২ সালের মার্চে প্রকল্পের মূল পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’। এরপর স্যাটেলাইট সিস্টেম কিনতে ফ্রান্সের কোম্পানি তালিস এলিনিয়া স্পেসের সঙ্গে একহাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার চুক্তি করে বিটিআরসি। পৃথিবীর কক্ষপথে একটি স্যাটেলাইট বসাতে প্রয়োজন হয় সুনির্দিষ্ট অরবিটাল স্লট। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার সংস্থা ইন্টারস্পটনিকের কাছ থেকে এই অরবিটাল স্লট ইজারা নিতে অনুমোদন দেওয়া হয় ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মাঝে স্যাটেলাইটের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়। এই সংস্থা গঠনে মূলধন হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

ওজন: স্যাটেলাইটটির ওজন তিন হাজার ৫০০ কেজি বা ৩৩ টন।

আয়ু: মহাকাশে স্যাটেলাইটের কার্যকারিতার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল থাকে। তিন হাজার ৫০০ কেজি উৎক্ষেপণ ভরের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মিশনের মেয়াদকাল হবে ১৫ বছর।

ট্রান্সপন্ডার: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে রয়েছে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এর ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে নেপাল, মিয়ানমার ও ভুটানের কাছে স্যাটেলাইট সেবা দিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।


ভাড়া দিয়ে বছরে আয়: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দেওয়া হবে তা থেকে বছরে প্রায় ১০৪০ কোটি ডলার আয় হবে বলে ধরন করা হচ্ছে।

ব্যান্ডউইথ: ১৬০০ মেগাহার্জ।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কেইউ-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডারের স্পট বিমের আওতায় থাকবে বাংলাদেশ ও বঙ্গপোসাগরের জলসীমা। অন্যদিকে এই ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডারের রিজিওনাল বিমের আওতায় রয়েছে ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়া। রিজিওনাল সি-ব্যান্ড বিমের আওতায় থাকা দেশগুলো হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কিমেনিস্তান এবং কাজাখস্তানের কিছু অংশ। ফলে এসব দেশে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দিতে পারবে বঙ্গবন্ধু-১।

কক্ষপথ: সফলভাবে উৎক্ষেপণ ও সব কাজ শেষে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ হবে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার উপরে ‘জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিটের’ একটি কৃত্রিম উপগ্রহ। জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট হল এমন একটি কৃত্রিম উপগ্রহ যেটি নিরক্ষ রেখা বরারবর ওই কক্ষপথে থেকে পৃথিবীকে ২৪ ঘণ্টায় একবার প্রদক্ষিণ করবে। এই প্রদক্ষিণ হবে পৃথিবীর আবর্তনের দিকে, অর্থাৎ পশ্চিম থেকে পূর্বে। ফলে গ্রাউন্ড স্টেশনের সাপেক্ষে উপগ্রহটি থাকবে প্রায় স্থির। এ কারণেই ‘জিওস্টেশনারি’ শব্দটি এসেছে। মহাকাশযাত্রায় প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে স্যাটেলাইটটি স্থাপিত হবে মহাকাশের ১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের অরবিটাল স্লটে।

সুবিধা:বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ বাংলাদেশকে গুণতে হয় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পর বাংলাদেশ সেই নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে বলে সরকার আশা করছে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের বিদ্যমান টেরেস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করা যাবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চাকরির নতুন ক্ষেত্র ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।সরকারি এই প্রকল্প নিয়ে অন্যতম প্রত্যাশা হচ্ছে নিজস্ব এই স্যাটেলাইট বাংলাদেশে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে ভূমিকা রাখবে। ডাইরেক্ট টু হোম (ডিটিএইচ) পদ্ধতিতে স্যাটেলাইট থেকে সিগনাল গ্রহণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলেও সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচার করা সম্ভব হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন