গতি নবম-দশম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান

February 01, 2019


• স্থিতি ও গতি• বিভিন্ন প্রকার গতি• স্কেলার রাশি ভেক্টর রাশি• দূরুত্ব ও সরণ• দ্রুতি ও বেগ• ত্বরণ মন্দন• গতির সমীকরণ• পরন্ত বস্তুর গতি

স্থিতি ও গতি

একটা স্থির বস্তুর সাপেক্ষে আরেকটা বস্তুর যদি অবস্থানের পরিবর্তন হয় তবে বস্তুটা গতিশীল। একটা গতিশিল বস্তুর সাপেক্ষে আরেকটা গতিশিল বস্তু এক রকম ভাবে চলতে থাকে তবে একটি আরেকটির সাপেক্ষে স্থির। যেমন চলন্ত ট্রেনে যদি ২ জন ব্যাক্তি সামনা সামনি মুখ করে বসে, তাদের তো আর অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে না। তাহলে চলন্ত ট্রেনের মধ্যে এরা কিন্তু স্থির। কিন্তু ট্রেনের বাহিরে একজন লোক দাড়িয়ে তাদের দেখছে, তখন বাহিরের জনের সাপেক্ষে ট্রেনের ভেতরের ২ জন গতিশিল। তাহলে প্রসঙ্গ কাঠামো হলো আমি যার সাপেক্ষে কোনো একটা বস্তুর স্থিতি বা গতি নির্ণয় করবো।তাহলে স্থিতি হলো সময়ের সাথে কোনো একটি প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে যদি কোনো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন না হয় তবে সেটা স্থির। আর বস্তুর অবস্থানটা বা প্রকৃতিটা অপরিবর্তিত থাকাটা হলো স্থিতি।সময়ের সাথে প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে যদি বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে তখন তাকে গতিশিল বস্তু বলে। আর অবস্থানের পরিবর্তনের ঘটনাকে বলে গতি।এখানে একটা প্রশ্ন করা হয় প্রায় যে “প্রমান কর যে প্রথিবীতে সকল গতি আপেক্ষিক, সকল স্থিতি আপেক্ষিক, কোনোটায় পরম গতিশিল না কোনোটায় পরম স্থিতিশিল না।” এটা সত্য। কারণ আমি কোনো কিছুকে এককেবারে ১০০% স্থির বলতে পারবে না। কারণ আমি যদি বলি, আমি যে কম্পিউটারে লিখছি, আমি আর আমার কম্পিউটার একজন আরেক জনের সাপেক্ষে স্থির। এটা সত্য। কিন্তু আমি এবং আমার কম্পিউটার পৃথিবীতে আছি। পৃথিবী কিন্তু সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। সে হিসেবে পৃথিবীর উপরের সকল বস্তু সূর্যের সাপেক্ষে গতিশিল। আবার পৃথিবীর মত গতিশিল অন্য কোনো গ্রহ যদি গ্যালাক্সির মধ্যে ঘুরতে থাকে তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবী গ্রহটা স্থির হবে। অর্থাৎ কোনো কিছুকে আমরা পরম স্থিতিশিল বা পরম গতিশিল বলতে পারবো না। সব হচ্ছে আপেক্ষিক।

বিভিন্ন প্রকার গতি


রৈখিক গতি: কোনো বস্তু যদি একটি সরল রেখা বরাবর গতিশিল হয়, অর্থাৎ একটা সোজা রাস্তার মধ্যে কোনো বস্তুর যে গতি সেটা হলো রৈখিক গতি।

ঘূর্ণন গতি: কোনো বস্তু যদি কোনো রেখাকে কেন্দ্র করে ঘোরে তখন সে গতিকে ঘূর্ণন গতি বলে। যেমন বৈদ্যুতিক পাখার গতি, তারপর আছে ঘরির কাটার গতি।

চলন গতি: যে কোনো বস্তু গতিশিল হলে সেটা সরলরৈখিক, কৌনিক, বৃত্তাকার, উপবৃত্তাকার, যেরকম গতিশিল হোক না কেন সেটা হবে চলন গতি।

পর্যায়বৃত্ত গতি: পর্যায় বৃত্ত গতিটা হচ্ছে যে গতিটা বারবার হয়। মানে ধর একয় গতিতে এক দিকে চলতে থাকে। যেমন ধর ফ্যানের গতি।

স্পন্দন গতি: একটা পূর্ণ পর্যায়কাল সম্পন্ন করার সময় অর্ধেক সময় এক দিকে আর বাকি অর্ধেক সময় তার বিপরীত দিকে। যেমন ধর সরল দোলকের ক্ষেত্রে চিন্তা কর, দোলকটি তার পূর্ণ পর্যায়কাল সম্পন্ন করতে যদি ২ সেকেন্ড সময় নেয়, তাহলে সে এক সেকেন্ডে বাম দিকে আর এক সেকেন্ডে ডান দিকে যাবে। এ ধরনের গতিকে স্পন্দন গতি বলে।সকল স্পন্দন গতি পর্যায়বৃত্ত গতি কিন্তু সকল পর্যায়বৃত্ত গতি স্পন্দন গতি নয়। কারন সকল পর্যায়বৃত্ত গতি কিন্তু একটা পর্যায়কালের বাকি অর্ধেক সময়ে বস্তুর বিপরিত দিকে নাও আসতে পারে।

স্কেলার রাশি

যে সকল রাশিকে প্রকাশ করতে মানের প্রয়োজন হয় তাকে স্কেলার রাশি বলে। উদাহরন দৈর্ঘ, ভর, দ্রুতি, কাজ, শক্তি সময়, তাপমাত্রা। এক্ষেত্রে দিকের কোনো প্রয়োজন হয় না।

ভেক্টর রাশি

যে সকল রাশিকে প্রকাশ করতে মান ও দিক উভয়ের প্রয়োজন হয় তাকে ভেক্টর রাশি বলে। উদাহরন সরন, ত্বরণ, মন্দন, বেগ, বল, ওজন। এসকল ক্ষেত্রে মানের যেমন প্রয়োজন দিকের ও ঠিক তেমন প্রয়োজন।

দূরুত্ব ও সরণ


ধর ২টা বিন্দু A এবং B । এখন A থেকে B তে কত ভাবে যাওয়া যাবে তার বিন্নাস সমবেশ করে পৃথিবীতে শেষ করা যাবে না। কারণ A থেকে B তে যেতে নিচে চিত্রে লক্ষ কর, যেদিক দিয়ে খুশি যাওয়া যায়

এখন কথা হচ্ছে A যদি কোনো আকাবাকা পথে ১০ মিটার অতিক্রম করে, অবার আরেকটা আকাবাকা পথে ৮ মিটার অতিক্রম করে তবে এটা হলো দূরত্ব। কিন্তু A যদি B তে সরাসরি সরল রেখা বরাবর যায় তবে সেটা হবে সরণ। অর্থাৎ কোনো বস্তু থেকে কোনো বস্তুর দিকে যে ক্ষুদ্রতম দূরুত্ব সেটা হলো সরণ। আর একটা বস্তু থেকে আরেকটা বস্তুর দিকে যে অবস্থানের পরিবর্তন সেটা হচ্ছে দূরত্ব। দূরত্ব কে d দ্বারা প্রকাশ করা হয় আর সরণ কে s দ্বারা প্রকাশ করা হয়। দূরত্বের একক এবং সরণের একক উভয় হচ্ছে মিটারে। উভয়ের একক হচ্ছে m, L হচ্ছে এর মাত্রা।

দ্রুতি ও বেগ

যে কোনো দিকে একক সময়ে যে অতিক্রান্ত দূরুত্ব সেটা হচ্ছে দ্রুতি। দ্রুতিকে প্রকাশ করা হয় v=d/t । আর বেগ হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট দিকে একক সময়ে যে অতিক্রান্ত দূরুত্ব সেটা হলো বেগ। বেগ কে প্রকাশ করা হয় v=s/t । বেগ কে আবার ২ ভাগে ভাগ করা যায়। একটা হচ্ছে সুষম বেগ আরেকটা হচ্ছে অসম বেগ। আমরা যদি সুষম বেগ ও অসম বেগের একটা স্কেল আকি তাহলে: সুষম বেগের ক্ষেত্রে:সুষম বেগের ক্ষেত্রে গ্রাফ


চিত্রে T যদি সময় হয় আর S যদি সরণ হয় সুষম বেগের গ্রাফটা হবে এ রকম। প্রতি সময়ে সে এক রকম দূরুত্ব অতিক্রম করবে। উদাহরন হতে পারে শব্দের বেগ। অসম বেগের ক্ষেত্রে:অসম বেগের ক্ষেত্রে গ্রাফ

এক্ষেত্রে যে কোনো রকম কম বেশি হতে পারে। দ্রুতির ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় যে “ তাৎক্ষণিক দ্রুতি কাকে বলে?” কোনো একটা বস্তুর কোনো এক বিশেষ মূহুর্তের দ্রুতিকে তাৎক্ষনিক দ্রুতি বলে। উভয়ের একক হচ্ছে m/s, LT^-1 হচ্ছে এর মাত্রা।

ত্বরণ মন্দন

আসলে ত্বরণ ২ ধরনের। একটা হলো ধনাত্মক ত্বরন আরেকটা হলো ঋনাত্মক ত্বরন। ঋনাত্মক ত্বরনটা্ হলো মন্দন। ত্বরন মানে হচ্ছে বেগ বৃদ্ধি পাবে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বস্তুর বেগের পরিবর্তনকে বলা হয় ত্বরন। এখন যদি সময়ের সাথে সাথে বস্তুর বেগের পরিবর্তন যদি ঋনাত্মক হয়, অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে বস্তুর বেগের হার যদি কমে তাহলে সেটাকে মন্দন বলে। আর বাড়লে ত্বরন। ত্বরন ও মন্দন উভয় কে a দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

আমরা জানি a=(v-u)/t

তোমরা জানো v মানে শেষ বেগ, u মানে আদি বেগ, t মানে সময়। আমরা যদি এ সূ্ত্র দ্বারা অঙ্ক করি তাহলে ত্বরনের ক্ষেত্রে পাবো (+) মান আর মন্দনের ক্ষেত্রে পাবো (-) মান। এ ত্বরন ও মন্দন উভয় ভেক্টর রাশি। উভয়ের একক হচ্ছে m/s^2, LT^-2 হচ্ছে এর মাত্রা।

গতির সমীকরণ


v=u+at এর প্রমানের যুক্তিটা দেখা যাক।

v=u+at এর প্রমান

ধর একটা গতিশিল ব্স্তু u আদিবেগ নিয়ে a ত্বরনে চলে t সময়ে v শেষবেগ প্রাপ্ত হয়। ধর u 10m/s, v হচ্ছে 30m/s । অতিক্রম করেছে 5s সেকেন্ডে। তাহলে আমি বলবো
a=(v-u)/t
বা v-u=at
বা v=u+at
যদি কোনো বস্তু স্থির অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করে তবে u এর মান হবে 0 । u এর মান  0 হলে v=at হবে । আর কোনো বস্তুর ত্বরন যদি দ্রুব থাকে, দ্রুবর আগে যদি (=) সমান থাকে তাহলে আমরা বলি v সমানুপাতিক t । ঠিক এক রকম ভাবে প্রমান করা যাবে।
১. s=(u+v)/2*t
২. s=ut+(1/2)at^2
৩. v^2=u^2+2as

পরন্ত বস্তুর গতি


বিঙ্গানি গ্যালিলি ইতালির পিছা শহরের একটা হেলানো টাওয়ার থেকে বিভন্ন রকম বস্তু তিনি নিচে ফেলে দেন এবং তা পর্যবেক্ষন করে তিনটা সূত্র দেন। এখন সূত্রগুলো ছিলো এ রকম, কোনো বস্তুকে কোনো উচু জায়গা থেকে ছেরে দিলে। এখানে ভিত্তি হচ্ছে ২টা। ১. মুক্ত ভাবে ২. বিনা বাধায়। এখানে বিনা বাধায় বলতে বোঝানো হয়েছে বাতাসের যে বাধা। ধর এক টুকরা লোহা ও এক টুকরা কাগজ এক সময়ে নিচের দিকে কোনো রকম বল প্রয়োগ ছাড়া ছেড়ে দিলে লোহার টুকরোটা আগে পরবে এটা সকলে জানে। কাগজের টুকরোটা একটু হেলে দুলে পরবে। কারণ ওকে কিন্তু পেছন থেকে একটা চাপ দিচ্ছে। এ বাতাসের চাপ না থাকলে বস্তুকে মুক্ত ভাবে ছেরে দেয়া হলে পৃথিবীর সকল বস্তু সমান সময়ে সমান দূরুত্ব অতিক্রম করবে। গ্যালিলিওর
১ম সূত্রটা হলো: নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে বিনা বাধায় মুক্তভাবে পরন্ত সকল বস্তু সমান সময়ে সমান দূরুত্ব অতিক্রম করবে।
২য় সূত্র: বিনা বাধায় মুক্ত ভাবে পরন্ত বস্তুর নির্দিষ্ট সময়ে প্রাপ্তবেগ সময়ের সমানুপাতিক (v t) । অর্থাৎ t যত বাড়বে v তত বাড়বে। বাড়বে কারণ মুক্তভাবে পড়তে থাকলে এখানে একটা ত্বরণ কাজ করে সেটা হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ g।
৩য় সূত্র: স্থির অবস্থান থেকে বিনা বাধায় মুক্তভাবে পরন্ত কোনো বস্তুর অতিক্রান্ত দূরুত্ব সমযের বর্গের সমানুপাতিক।

অভিকর্ষজ ত্বরণ:

অভিকর্ষজ ত্বরণ বলতে বোঝায় অভিকর্ষের প্রভাবে কোনো বস্তুর বেগ প্রতি সেকেন্ডে যে হারে বাড়তে থাকে সেটা হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ। g=9.8ms^(-2) এবং এটা নির্দিষ্ট নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এটা বিভিন্ন। কারণ পৃথিবী গোল নয়, এটা কিছুটা চেপ্টা। তো মাঝখানে যে কেন্দ্রটা আছে এখান দিয়ে হচ্ছে বিষুবিয় অঞ্চল, এবং ২ পাশে মেরু অঞ্চল।


পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে পৃষ্ঠের দূরত্ব

চিত্রে ব্যাকেট দিয়ে দেখানো দুরত্বের উপর অভিকর্ষজ ত্বরনের কম বেশি হওয়ার প্রভাব রয়েছে। প্র্রভাবটা বুঝতে হলে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র বুঝতে হবে। নিউটনের সূত্রমতে এ মহাবিশ্বে যে কোনো ২টি বস্তু একে অপরকে তাদের কেন্দ্র বরাবর একটি নির্দিষ্ট সরলরেখায় আকর্ষণ করে। এ আকর্ষন বলের মান তাদের ভরের এবং মধ্যবর্তি দূরত্বের উপর নির্ভর করে।



অর্থাৎ বস্তু কণাদ্বয়ের মধ্যে যদি ভর বাড়ে তাহলে এদের মধ্যে আকর্ষণ বল বাড়বে। বস্তু কণাদ্বয়ের মধ্যে যদি দূরত্ব বাড়ে তাহলে এদের মধ্যে আকর্ষণ সমানুপাতিক ভাবে কমবে।তাহলে

মহাকর্ষ দ্রুবক G এর মান

G এর মান যদি মহাকর্ষ দ্রুবক হয়ে থাকে এবং ২টা বস্তুর ভর এবং দূরত্ব যা হোক না কেন নিউটনের সূত্র হচ্ছে উপরের চিন্হিত সূত্রটি । এখন যদি d এর মান বাড়ে তাহলে আকর্ষণ কমবে। কিভাবে কমবে যেহেতু d^2 ? দূরুত্ব যদি ২গুন বাড়ে তাহলে আকর্ষন ¼, দূরুত্ব যদি ৩গুন বাড়ে তাহলে আকর্ষন 1/9 মানে ৯গুন ভাগ কমবে। ভর যদি দ্বিগুন বাড়ে আকর্ষন দ্বিগুন বাড়বে। ভর যদি চার গুন বাড়ে তাহলে আকর্ষন বল ও চার গুন বাড়বে। দূরুত্ব যদি চার গুন বাড়ে আকর্ষন বল ১৬ভাগ কমবে। তাহলে বিষুবিয় অঞ্চলে বা মেরু অঞ্চলে যদি কোনো বস্তু থাকে এবং পৃথিবী বস্তু গুলোকে কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করছে। যেহেতু d1 এর দূরুত্ব কম এবং d2 এর দূরুত্ব বেশি।পৃথিবীর পৃষ্ঠে বস্তুর ওজন নির্ণয়সেহেতু মেরু অঞ্চলে d1 দূরুত্ব কম থাকায় g এর মান বেশি, বস্তুর ওজন ও বেশি হবে এবং বিষুবিয় অঞ্চলে d2 দূরুত্ব বেশি থাকায় g এর মান কম, বস্তুর ওজন ও কম হবে। এ g এর সূত্রটা হচ্ছেg অভিকর্ষজ ত্বরন নির্ণয়ের সূত্র

R মানে হচ্ছে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ । তাহলে আমরা বলতে পারি d=R ।

সুতরাং,

এটা হচ্ছে সে সূত্র যেটা দিয়ে আমরা কোনো স্থানের g মান বের করতে পারবো। g এর মান বিষুবিয় অঞ্চলে হচ্ছে g=9.7892m/s^2, মেরু অঞ্চলে g=9.8321 m/s^2, আদর্শ মান g=9.80665m/s^2 45 ডিগ্রি সমুদ্র অক্ষাংশে।

0 Comments