ল্যাবরেটরির নিরাপদ ব্যবহার - রসায়ন

May 30, 2021

সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং চলছে নিত্যনতুন গবেষণা। রসায়নের নানারকম গবেষণা,যাবতীয় পরীক্ষণ এবং বিশ্লেষণের জন্য রসায়ন গবেষণাগার বা ল্যাবরেটরি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। তোমরা তোমাদের স্কুল- কলেজে হয়তো রসায়ন পরীক্ষাগার পরিদর্শন করে থাকবে।

গবেষণাগারে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় উপকরণ, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি,যন্ত্রপাতির পরিষ্কার এবং ব্যবহার কৌশল, বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার, পরিমাপ এবং এদের ক্ষতিকর দিক ইত্যাদি নানা বিষয় সম্পর্কে  ল্যাবরেটরির নিরাপদ ব্যবহার নামক এই অধ্যায়ে বিস্তারিত সব কিছু আলোকপাত করা হয়েছে৷

আজকে এই অধ্যায়ের প্রথম খন্ডে ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় উপাদান, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণ, হ্যাজার্ড সিম্বল এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবো। 

ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত উপকরণ

ল্যাবরেটরিতে প্রবেশের পূর্বেই ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত নানারকম উপকরণ এবং এদের ব্যবহার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় নানা দূর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। 

তাই প্রথমেই জেনে নেই ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং তাদের ব্যবহারবিধি সম্পর্কে। 

অ্যাপ্রোন (Apron)

ল্যাবরেটরিতে প্রবেশের পূর্বে অবশ্যই সাদা, ফুলহাতা শোষণকারী উপাদানের কাপড় দিয়ে তৈরী অ্যাপ্রোন পরিধান করতে হবে।

এসিড, ক্ষার বা এ জাতীয় ক্ষতিকর উপাদান ছিটকে পড়ে যাতে ঝুঁকির সৃষ্টি না করে তাই অবশ্যই এপ্রোন পরিধান করা আবশ্যক।

নিরাপদ গ্লাস/গগলস ( Safety Glass/Goggles)

ল্যাবরেটরিতে অবশ্যই নিরাপদ গ্লাস অর্থাৎ চশমা কিংবা গগলস পরিধান করতে হবে। চোখে নিরাপদ গ্লাস বা গগলস থাকলে কোনো রাসায়নিক দ্রব্য বা ক্ষতিকর ধোঁয়া চোখে প্রবেশ করে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে নিরাপদ চশমা পরিধান করা প্রয়োজন। 

মাস্ক ( Mask) 

ল্যাবরেটরিতে প্রবেশের পূর্বে অবশ্যই মাস্ক পরিধান করতে হবে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সময় উৎপন্ন রাসায়নিক গ্যাস বা ধোঁয়া শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে যাতে কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেজন্যই মূলত মাস্ক পরিধান করতে হবে।

হ্যান্ডগ্লাভস (Hand Gloves)

গবেষণাগারে যেকোনো কাজ শুরুর পূর্বে অবশ্যই হ্যান্ড গ্লাভস পরিধান করতে হয়। ল্যাবরেটরিতে কাজের উপর ভিত্তি করে নানা ধরনের গ্লাভস রয়েছে৷ নিচে কয়েক ধরনের গ্লাভস এর বর্ণনা দেওয়া হলো।

  • নিওপ্রিন গ্লাভসঃ এটি বেশ নরম এবং তাপরোধী। মৃদু ক্ষয়কারী পদার্থ,তেল জাতীয় দ্রবণ এবং জৈব দ্রাবক নিয়ে কাজ করার সময় এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
  • জিটেক্স গ্লাভসঃ জ্বলন্ত বস্তু নিয়ে কাজ করার সময় এই তাপসহনীয় গ্লাভস ব্যবহৃত হয়।
  • ভিনাইল গ্লাভসঃ PVC দিয়ে তৈরী এই গ্লাভস মৃদু ক্ষয়কারী পদার্থ এবং ত্বকে বিরক্তিকর অনুভূতি প্রদানকারী দ্রবণের ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়।
  • লেটেক্স গ্লাভসঃ চামড়ায় ক্ষয় এবং জ্বালা সৃষ্টিকারী রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারের সময় এই গ্লাভস ব্যবহৃত হয়।
  • প্রাকৃতিক রাবার গ্লাভসঃ সাধারণ প্রাকৃতিক রাবার গ্লাভস মৃদু ক্ষয়কারী পদার্থের সংস্পর্শ এবং বৈদ্যুতিক শক প্রতিরোধে কার্যকরী হয়ে থাকে।

বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য সরাসরি হাতে স্পর্শ করলে ত্বকে অ্যালার্জি বা প্রদাহের সৃষ্টি হতে পারে, তাই গ্লাভস পরিধানের মাধ্যমে এসব রাসায়নিক দ্রব্যাদি স্পর্শ করা নিরাপদ বলে পরিগণিত হয়।


প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রপাতি ( Laboratory Apparatus)

টেস্টটিউব (Test tube)

গবেষণাগারে বিভিন্ন ধরনের টেস্টটিউব ব্যবহার হয়ে থাকে। এগুলো সাধারণ পাতলা কাচের হয়ে থাকে। কোনো রাসায়নিক পদার্থের স্থানান্তর,তাপ প্রয়োগ এবং পর্যবেক্ষণের জন্য টেস্টটিউব ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

বিকার (Beaker)

গবেষণাগারে নানা পরিমাপের ও নানা আকৃতির ছোট-বড় বিকার দেখতে পাওয়া যায়। এদের কাজ হলো কোনো তরল পদার্থ পরিমাণমত নেওয়া,তাপ দেওয়া এবং প্রয়োজনে অন্য পাত্রে স্থানান্তর করা। 

ব্যুরেট (Burette)

ব্যুরেটের সাহায্যে সুনির্দিষ্ট পরিমাণে তরল একপাত্র থেকে অন্যপাত্রে নেওয়া হয় এবং বিক্রিয়ার কাজ সম্পন্ন করা হয়। এটি মোটা কাচের সরু নল যার এক প্রান্তে স্টপ কর্ক থাকে এবং এর গায়ে দাগাঙ্কিত থাকে।

ব্যুরেট সাধারণত ২৫ সে.মি^৩ এবং ৫০ সে.মি^৩ আয়তনের হয়ে থাকে। অর্থাৎ ব্যুরেটের গায়ে দাগাঙ্কিত করে ২৫ টি বা ৫০ টি ভাগে ভাগ করা থাকে। প্রতি ভাগের আয়তন ১ সে.মি^৩।

প্রতি ১সে.মি^৩ কে আবার ১০টি ভাগে ভাগ করা থাকে। তাই একটি ক্ষুদ্রতম ভাগের আয়তন হয় ০.১ সে.মি^৩ হয়ে থাকে।

পিপেট (Pipette)

নির্দিষ্ট পরিমাণে তরল রাসায়নিক পদার্থকে এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে স্থানান্তরের জন্য সাধারণত পিপেট ব্যবহার করা হয়।

দুই ধরনের পিপেট দেখা যায়,একটা হলো সাধারণ এবং অন্যটি হলো দাগাঙ্কিত পিপেট। সাধারণ পিপেটগুলো সরু কাচ নল দ্বারা গঠিত।

তবে দাগাঙ্কিত পিপেটের দুই প্রান্ত সরু এবল মাঝখানে মোটা বাল্বের ন্যায় অংশ থাকে। ০.৫ mL থেকে শুরু করে ৫০ mL  পর্যন্ত  নানা আকৃতির পিপেট পাওয়া যায়। 

কনিক্যাল ফ্লাস্ক (Conical Flask)

আয়তনিক বিশ্লেষণের টাইট্রেশন বিক্রিয়া কনিক্যাল ফ্লাস্কে সংঘটিত করা হয়। কনিক্যাল ফ্লাস্কের নিচের দিকের অংশ মোটা এবং চ্যাপ্টা থাকে এবং উপরের দিকের অংশ অপেক্ষাকৃত সরু হয়ে থাকে।

সাধারণত ২৫০ সে.মি^৩ আয়তনের কনিক্যাল ফ্লাস্ক পাওয়া যায়। তবে প্রয়োজনবোধে বিভিন্ন আকৃতির কনিক্যাল ফ্লাস্কের ব্যবহার হয়ে থাকে।

আয়তনমিতিক ফ্লাস্ক (Volumetric Flask) 

সরু গলাযুক্ত কাচের পাত্র যার নিচের অংশ গোলাকার কিন্তু তলা চ্যাপ্টা বা সমতল আকৃতির তাকে আয়তনমিতিক ফ্লাস্ক বা মেজারিং ফ্লাস্ক বলা হয়ে থাকে।

ল্যাবরেটরিতে সাধারণত ১০০ সে.মি^৩,২৫০ সে.মি^৩,৫০০ সে.মি^৩ এবং ১ ডাইন.মি^৩ আয়তনের ফ্লাস্ক ব্যবহার করা হয়। সাধারণত যেকোনে ঘনমাত্রার প্রমাণ দ্রবণ তৈরীতে এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

রিয়েজেন্ট বোতল (Reagent Bottle)

ল্যাবরেটরিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণ করার জন্য সাধারণত দুই ধরনের রিয়েজেন্ট বোতল ব্যবহার করা হয়। একটি হলো বাদামী বর্ণের কাচের তৈরী এবং অপরটি হলো স্বচ্ছ কাচের তৈরী রিয়েজেন্ট বোতল। যেসব রাসায়নিক দ্রব্য সূর্যের আলোর সাথে বিক্রিয়া করে সেসব দ্রব্যকে সাধারণত বাদামী বর্ণের বোতলে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে।

ওয়াশ বোতল ( Wash Bottle) 

ওয়াশ বোতল হলো একটি প্লাস্টিকের বোতল যার মুখে রবার কর্ক লাগানো থাকে এবং কর্কের ফুটো দিয়ে এর মধ্যে একটি ৪৫° কোণে বাঁকানো নল ভেতরে প্রবেশ করানো থাকে। এটির মাধ্যমে পানি ভর্তি করে ফানেলের লেগে থাকা রাসায়নিক দ্রব্য ধৌত করে ফ্লাস্কে নেওয়া হয় এবং নির্ধারিত দাগ পর্যন্ত পূর্ণ করা হয়।

ফানেল (funnel) 

 ফানেল কোণাকার কাচ দিয়ে তৈরী সরু মুখবিশিষ্ট পাত্র যার মাধ্যমে পরিমাপক ফ্লাস্ক বা ব্যুরেটে তরল পদার্থ নেওয়া হয়।

বুনসেন বার্ণার (Bunsen Burner) 

 পরীক্ষাগারে কোনো রাসায়নিক দ্রব্যকে তাপ দেওয়ার জন্য বুনসেন বার্ণার ব্যবহৃত হয়। এই বার্নারে দুই ধরনের শিখা দেখতে পাওয়া যায়। একটি হলো অনুজ্জ্বল বা দীপ্তিহীন শিখা এবং অপরটি হলো উজ্জ্বল বা দীপ্তিমান শিখা। অনুজ্জ্বল শিখার আবার দুইটি জোন আছে। এগুলো হল অন্তস্থঃ নীল বিজারণ মন্ডল এবং বহিঃস্থ নীল অনুজ্জ্বল জারণ মন্ডল। 


স্পিরিট ল্যাম্প (Spirit Lamp)

এটি দেখতে কাচের তৈরী সাধারণ প্রদীপের মতো। এর ভেতরে 'স্পিরিট' জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি কম তাপোৎপাদী। স্বল্প তাপ প্রদানের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। 


বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণ

ধাতব Na: 

সোডিয়াম ধাতুটি পর্যায় সারনির গ্রুপ-১ অবস্থিত হওয়ায় এটি খুবই সক্রিয় ধাতু। এটি পানির সংস্পর্শে এলে তৎক্ষণাৎ আগুন ধরে যেতে পারে। তাই ল্যাবরেটরিতে সোডিয়াম ধাতু খোলা কিংবা বায়ুপূর্ণ পাত্রে রাখা একেবারেই অনুচিত। সোডিয়ামকে এজন্য ন্যাপথা বা কেরোসিন তেলে ডুবিয়ে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। 

NaOH দ্রবণঃ 

NaOH (কস্টিক সোডা) এর দ্রবণ একটি তীব্র ক্ষার। এটি চোখের সংস্পর্শে এলে চোখে জ্বালাপোড়া শুরু হতে পারে এবং চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এজন্য NaOH দ্রবণ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। এটিকে কাচের বোতলে রবার স্টপার ব্যবহার করে সংরক্ষণ করা হয়। কারণ এটি কাচ ক্ষয়কারী পদার্থ ও বটে। বোতলে সংরক্ষণ করার সময় এর সাথে নাম,রাসায়নিক সংকেত এবং ঘনমাত্রা যুক্ত লেবেল সংযুক্ত করা হয়।

NH3 দ্রবণঃ

 NH3 এর জলীয় দ্রবণ হলো NH4OH। এটি বোতলে সংরক্ষণ করার পর ভালোভাবে বোতলের মুখ বন্ধ করা উচিত অন্যথায় এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করে ব্রংকাইটিস সৃষ্টি করতে পারে।

নাইট্রিক এসিড (HNO3)

 HNO3 একটি শক্তিশালী এবং তীব্র এসিড। এটি আলোর সাথে বিক্রিয়া করে বিভাজিত হয়ে যায়। তাই এটিকে সংরক্ষণের সময় অবশ্যই বাদামী বোতলে রাখতে হবে। 


ঝুঁকি সতর্কীকরণ চিহ্ন

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মারাত্নক ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট সতর্কীকরণ প্রতীক রয়েছে যাদের মূলত ঝুঁকি সতর্কীকরণঃ চিহ্ন বা হ্যাজার্ড সিম্বল বলা হয়ে থাকে৷

মোট ১০ টি হ্যাজার্ড সিম্বলস রয়েছে। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনকারী পদার্থগুলো রাসায়নিকের বোতলের লেবেলে এসব প্রতীক সরবরাহ করে থাকে।

নিচে ছবির মাধ্যমে কিছু হ্যাজার্ড সিম্বল এবং এদের উদাহরণ দেখানো হল। 

ল্যাবরেটরির নিরাপদ ব্যবহার

ল্যাবরেটরির নিরাপদ ব্যবহারের অধ্যায়ের প্রথম খন্ডের আলোচনা আজ এই পর্যন্তই। পরবর্তী খন্ডে আমরা বাকি বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবো। সকলের জন্য রইল শুভকামনা।

Symbol source: UNECE.ORG

0 Comments